বাংলা সাময়িক পত্রিকার আবির্ভাব ও প্রসার | Emergence and Spread of Bengali Periodicals

বাংলা সাময়িক পত্রিকার আবির্ভাব ও প্রসার | Emergence and Spread of Bengali Periodicals

❏ প্রশ্ন:- বাংলা সাময়িক পত্রিকার আবির্ভাব ও প্রসার সম্পর্কে আলোচনা কর। (Emergence and Spread of Bengali Periodicals)

উত্তর:- ■ ভূমিকা:- মধ্যযুগে বাংলাভাষায় কোন সাময়িক পত্রের সন্ধান পাওয়া যায় না। সাময়িক পত্র সৃষ্টি হয়েছে আধুনিক যুগে। প্রধানত সংবাদ পরিবেশনের উদ্দেশ্যে সাময়িক পত্রিকার আবির্ভাব ঘটলেও পরবর্তীকালে তা বাংলা গদ্যের বাহন হয়ে পড়েছিল। বাংলা গদ্যের বিকাশে সাময়িক পত্রিকার অবদান অসামান্য। মধ্যযুগে বাংলা সাহিত্য কাব্যের পরিধিতে সীমাবদ্ধ ছিল, ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে কিছু গদ্য রচনা হলেও তা সাহিত্য কীর্তিতে উজ্জ্বল হতে পারে নি।

বস্তুত সাময়িক পত্রিকা প্রকাশনার পর থেকেই গদ্য রচনার উন্নতি হতে লাগল এবং গদ্য গ্রন্থ জনপ্রিয়তা অর্জন করতে সক্ষম হল। প্রখ্যাত সাহিত্য গবেষকের ভাষায়, “সাময়িক ও সংবাদপত্রের প্রবর্তনের পর হতেই বাংলা গদ্যের উন্নতির পথ অবাধ হইল। সাধারণ পাঠকের উপযোগী সংবাদ ও সরল কাহিনী পরিবেশনের বাহন হইয়াই সাময়িক পত্র সমসাময়িক বাঙ্গালী গদ্যের পঙ্গুত্ব ঘুচাইয়া ইহাকে প্রতিদিনের কাজকর্মের উপযোগী এবং সর্বসাধারণ উপভোগ্য রস সৃষ্টির বাহন করিয়া তোলে। ১৮১৮ খ্রীষ্টাব্দ হইতে আরম্ভ করিয়া আজ অবধি পত্রিকা’, ‘সোম প্রকাশ’, ‘বঙ্গদর্শন’, ‘ভারতী’, ‘জ্ঞানাঙ্কুর, ‘আর্যদর্শন’, ‘বান্ধব’, ‘নবজীবন’, ‘সাহিত্য’, ‘সাধনা’, ‘প্রবাসী’, ‘ভারতবর্ষ’, ‘সবুজপত্র’ ইত্যাদির নাম বাঙ্গালা সাহিত্যের ইতিহাসে অমর হইয়া আছে।”

■ প্রথম সাময়িক পত্র:- দিগদর্শন …… বঙ্গাল গেজেটি পত্রিকা : বাংলা ভাষায় প্রথম সাময়িক পত্রিকার নাম ‘দিগ্‌দর্শন’। এটি মার্শম্যানের সম্পাদনায় ১৮১৮ খ্রীষ্টাব্দের এপ্রিল মাসে প্রকাশিত হয়। এটি ছিল মাসিক পত্রিকা। শ্রীরামপুরের ইউরোপীয় মিশনারীদের দ্বারা এতে ইতিহাস, ভূগোল প্রভৃতি শিক্ষামূলক বিষয় ও নানা ধরনের বিস্ময়কর কাহিনী প্রকাশিত হত। গঙ্গকিশোর ভট্টাচার্যের সম্পাদনায় এখান থেকে প্রকাশিত হয় ‘বঙ্গাল গেজেটি পত্রিকা’। বাঙ্গালী সম্পাদিত প্রথম পত্রিকা হিসাবে এর একটি ঐতিহাসিক মূল্য আছে।

■সম্বাদকৌমুদী:- ‘সমাচার দর্পণের’ মাধ্যমে মিশনারীগণ এদেশের ধর্মের উপর আঘাত হানতে শুরু করেছিলেন। এতে রামমোহন রায় অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন। তিনি ১৮২১ খ্রীষ্টাব্দে ‘সম্বাদকৌমুদী’ নামে একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রচার করেন। রামমোহনের বিভিন্ন রচনা এই পত্রিকায় প্রকাশিত হত। ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন সম্পাদক। পরে তিনি সম্বাদ কৌমুদীর সাহিত সম্পর্ক ছিন্ন করে ১৮২২ খ্রীষ্টাব্দের মার্চ মাসে ‘সমাচার পত্রিকা’ নামে একটি পত্রিকা প্রকাশ করেন।

■ বসূদূত: ১৮২৯ খ্রীষ্টাব্দে রামমোহন রায়, দ্বারকানাথ ঠাকুর, প্রসন্নকুমার ঠাকুরের পৃষ্ঠপোষকতায় ‘বসুদূত’ নামে একটি পত্রিকা প্রকাশিত হয় যার সম্পাদক ছিলেন নীলরতন হালদার। এই পত্রিকায় নানা ধরনের সংবাদ ও নিবন্ধ প্রকাশিত হত।

■ সংবাদ প্রভাকর: বাংলা সাময়িকপত্রের ইতিহাসে ‘সংবাদ প্রভাকর’ নানা দিক দিয়েই উল্লেখযোগ্য। এটি শুধু সংবাদপত্রই ছিল না, সংবাদ পরিবেশনের মাধ্যমে জনমত সৃষ্টির ক্ষেত্রে এই পত্রিকাটি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা গ্রহণ করেছিল। ১৮৩০ খ্রীষ্টাব্দে ঈশ্বর গুপ্তের সম্পাদনায় ‘সংবাদ প্রভাকর’ পত্রিকা প্রকাশিত হয়। এই পত্রিকা তৎকালে প্রভূত জনপ্রিয় ছিল। এর সাপ্তাহিক, মাসিক ও দৈনিক সংস্করণ প্রকাশিত হত। জনমানসে এই পত্রিকার প্রভাব ছিল ব্যাপক।

এর মাধ্যমেই বঙ্কিমচন্দ্র, দীনবন্ধু মিত্র প্রমুখ সাহিত্যিকের আবির্ভাব ঘটেছিল। এই পত্রিকার পৃষ্ঠায় প্রাচীন বাংলা কবি ও কাব্য সম্পর্কে অনুসন্ধান ও গবেষণার সূত্রপাত করা হয়েছিল। তবে ঈশ্বরচন্দ্র পদ্যে যতটা দক্ষতা দেখাতে পেরেছিলেন, সাময়িক পত্রের গদ্য রচনায় তার কিছুই পারেননি। তার গদ্য রচনা ছিল অপরিণত দীর্ঘায়ত ও অনুপ্রাসবহুল। দেড় বছর ‘সংবাদ প্রভাকর’ বন্ধ থাকার পর ১৮০৬ সালে সংবাদ প্রভাকর’, ‘বারত্রয়িক’ অর্থাৎ সপ্তাহে তিনটি করে সংখ্যা প্রকাশিত হত। ১৮৩৯ সালে এটি দৈনিক পত্রিকারূপে প্রকাশিত হতে থাকে। মনে রাখা দরকার ‘সংবাদ প্রভাকর’ বাংলা ভাষায় প্রথম দৈনিক সংবাদপত্র। সংবাদ প্রভাকরের পাতায় প্রথম বাঙালীর স্বদেশচেতনার উদ্ভব ঘটেছিল।

■ জ্ঞানান্বেষণ জ্ঞানোদয় ও বিজ্ঞান সেবধী পত্রিকা:- জ্ঞান বিজ্ঞান প্রসারের জন্য তৎকালে শিক্ষিত মানুষের মনে আগ্রহের সঞ্চার হয়েছিল। এই উদ্দেশ্যে প্রকাশিত হয়েছিল জ্ঞান বিজ্ঞানমূলক পত্রিকা। ১৮৩১ সালে প্রকাশিত হল জ্ঞানান্বেষী উদারপন্থী তরুণদের উদ্যোগে ‘জ্ঞানান্বেষণ পত্রিকা’। ১৮৩১ সালে হিন্দু কলেজের বিখ্যাত শিক্ষক রায়চন্দ্র মিত্র’ জ্ঞানোদয় পত্রিকা প্রকাশ করেন। ১৮৩২ সালে গঙ্গাচরণ সেন প্রকাশ করেন ‘বিজ্ঞান সেবধী’ পত্রিকা। ১৮৩৫ সালে প্রকাশিত হয় ‘সংবাদ পূর্ণোদয়”।

■ তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা:- বাংলা সাময়িক পত্রের ইতিহাসে তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা নতুন ধারার প্রবর্তক। ১৮৪৩ খ্রীষ্টাব্দে দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রমুখের পৃষ্ঠপোষকতায় এবং অক্ষয়কুমার দত্তের সম্পাদনায় ‘তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা’ প্রকাশিত হয়ে বাংলা সাহিত্যে এক নব যুগের সূচনা করল। অক্ষয়কুমার দত্তের নীতিগর্ভ বিজ্ঞান বিষয়ক জ্ঞানোদ্দীপক প্রবন্ধগুলি এই পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। এই পত্রিকার লেখক গোষ্ঠীর মধ্যে ছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর, রাজনারায়ণ বসু প্রমুখ। তৎকালে বহু শিক্ষায়তনে এই প্রত্রিকাটি শিক্ষণীয় পাঠ্যরূপে নির্দিষ্ট ছিল।

■ বিবিধার্থ সংগ্রহ পত্রিকা:- ১৮৫১ খ্রীষ্টাব্দে রাজেন্দ্রলাল মিত্র ‘বিবিধার্থ সংগ্রহ’ নামে একটি মাসিক পত্রিকা প্রকাশ করেন। জ্ঞান – বিজ্ঞানবিষয়ক বহু প্রবন্ধ ও কৌতুহলোদ্দীপক তথ্য উপাখ্যান এই পত্রিকায় প্রকাশিত হয়ে মানুষের জ্ঞানবুদ্ধিতে বিশেষ সহায়ক হয়েছিল।

■ মাসিক পত্রিকা:- যে সকল পত্রিকার উল্লেখ করা হল, সেগুলি সবই ছিল সাধুভাষাশ্রিত। রাধানাথ শিকদার ও প্যারীচরণ মিত্র সাধারণ মানুষ ও নারী সমাজের জন্য চলিত ভাষায় ১৮৫৪ খ্রীষ্টাব্দে একটি পত্রিকা প্রকাশ করলেন যার নাম ছিল ‘মাসিক পত্রিকা। এর মধ্যে গদ্য পদ্য সবকিছুই চলিত ভাষায় রচনা করা হত এবং এর মধ্যে ছিল তদ্ভব, আরবী, ফারসী ও দেশী শব্দের সমাবেশ।

■ সোমপ্রকাশ পত্রিকা:- ১৮৫৭ সালে পণ্ডিত দ্বারকানাথ বিদ্যাভূষণ প্রকাশ করেন ‘সোমপ্রকাশ’ পত্রিকা। এটি ছিল রাজনৈতিক চেতনাশ্রয়ী পত্রিকা। এই পত্রিকায় ব্রিটিশ শাসনব্যবস্থার সমালোচনা প্রকাশিত হত।

■ ভারতী পত্রিকা:- ১৮৭৭ খ্রীষ্টাব্দে জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ী থেকে প্রকাশিত হয় ‘ভারতী’ পত্রিকা। রবীন্দ্রনাথ ও দ্বিজেন্দ্রনাথ ছিলেন এই পত্রিকার প্রধান লেখক। এই পত্রিকাকে কেন্দ্র করে শক্তিশালী এক লেখক গোষ্ঠী গড়ে উঠেছিল।

■ বঙ্গবাসী, হিতবাদী ও সাধনা পত্রিকা:- ১৮৮১ সালে যোগেন্দ্রনাথ বসু প্রকাশ করেন বিখ্যাত ‘বঙ্গবাসী’ পত্রিকা। এই পত্রিকায় জ্ঞান বিজ্ঞানের নানা বিষয় প্রকাশিত হত। ১৮৯১ সালে কৃষ্ণকমল ভট্টাচার্যের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়েছিল ‘হিতবাদী’ পত্রিকা। এতে রবীন্দ্রনাথের অনেক গল্প প্রকাশিত হয়েছিল। ১৮৯১ সালে সুধীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সম্পাদনায় প্রকাশিত হল ‘সাধনা’। এখানে রবীন্দ্রনাথের বহু রচনা প্রকাশিত হয়েছিল।

■ বসুমতী, প্রবাসী ও ভারতবর্ষ পত্রিকা:- ১৮৯৬ সালে প্রকাশিত হয়েছিল কালীপ্রসন্ন চট্টোপাধ্যায়ের সম্পাদনায় ‘বসুমতী পত্রিকা’। ১৯০১ সালে এলাহাবাদ থেকে রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় খুব জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল। দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, ফণীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, জলধর সেন এর সম্পাদনা করেছেন।

■ সবুজপত্র পত্রিকা:- ১৯১৪ খ্রীষ্টাব্দে প্রমথ চৌধুরীর সম্পাদনায় প্রকাশিত হল ‘সবুজপত্র’ পত্রিকা। এটি ছিল ভাষা আঙ্গিক ও বিষয়বস্তুর দিক দিয়ে সম্পূর্ণ নতুন ধরনের পত্রিকা। এর ভাষা ছিল কথ্য ভাষা, রুচি ছিল নাগরিক। এই পত্রিকার মাধ্যমে প্রমথ চৌধুরী সাহিত্যচিন্তায়, ভাষাচর্চায়, মননে, প্রকাশভঙ্গীতে, সকল প্রকার অস্পষ্টতা, ভাবালুতা, বিশ্লেষণ বাহুল্য, ক্রিয়াপদের একঘেয়েমি দুর করতে চেয়েছিলেন। এই পত্রিকায় লিখতেন শক্তিশালী লেখকগোষ্ঠী। আধুনিক গদ্যের প্রসারে এই পত্রিকার অবদান অসামান্য।