filmmaker Satyajit Ray

চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়; (The greatest filmmaker Satyajit Ray 1921-1992 খ্রিস্টাব্দ) জন্ম-বংশ পরিচয়; শিক্ষা; কর্মজীবন; চলচ্চিত্র পরিচালনায়; সাহিত্যকর্ম; সম্মান লাভ

The greatest filmmaker Satyajit Ray: World-renowned filmmaker Satyajit Ray is not with us today. 7 days long. Fighting to the death, he left this world on April 23 (1992) at 5-32 pm. He was a unique personality as a world-renowned filmmaker. He is also a well-known writer and playwright of Unique Creator.

চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায় (Filmmaker Satyajit Ray):

বিশ্ববন্দিত চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায় আজ আমাদের মধ্যে নেই । দীর্ঘ ৮৭ দিন । মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে ২৩ এপ্রিল (১৯৯২ ) বিকাল ৫-৩২ মিনিটে তিনি এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যান । বিশ্ববরেণ্য চলচ্চিত্রস্রষ্টা হিসেবে তিনি ছিলেন অনন্য ব্যক্তিত্ব । আবার সুসাহিত্যিক ও চিএনাট্যকার হিসেবেও তিনি অনন্য স্রষ্টা।

Filmmaker Satyajit Ray
Filmmaker Satyajit Ray

চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়ের জন্ম , বংশপরিচয় ও শিক্ষা (Filmmaker Satyajit Ray’s birth, genealogy and education):

১৯২১ খ্রিস্টাব্দের ২ মে সত্যজিৎ রায়ের জন্ম । পিতা সুকুমার রায় ; মাতা সুপ্রভা দেবী । তার পিতামহ স্বনামধন্য উপেন্দ্রকিশাের রায়চৌধুরী । পিতার ৩২ বছর বয়সে মৃত্যু হলে মাত্র ২ ১/২বছরের শিশু সত্যজিৎ রায়কে মানুষ করার জন্য সুপ্রভা দেবীকে অনেক দুঃখ – কষ্ট সহ্য করতে হয়। সত্যজিতের শৈশব কাটে উত্তর কলকাতার ১০০ নম্বর গড়পাড় রােডের বাড়িতে । পাঁচ বছর বয়সে তারা বকুল বাগানের বাড়িতে চলে আসেন । ৮ বছর বয়সে সত্যজিৎ বালিগঞ্জ গভর্নমেন্ট হাই স্কুলে ভরতি হন । ব্ৰহ্মসংগীত , রবীন্দ্রসংগীত , ভারতীয় মার্গসংগীত এবং পাশ্চাত্য সংগীতে তিনি ছিলেন গভীর মনােযােগী । ১৯৩৬ থেকে ১৯৩৯ পর্যন্ত তিনি কলেজে কাটান । এ সময়ে তিনি ইংরেজি ভাষাও অনবদ্যভাবে রপ্ত করেন । ১৯৩৯ – এ তিনি বিএ পাস করেন। তাঁর জীবনে নন্দলাল বসু এবং বিনােদবিহারী মুখােপাধ্যায় দারুণভাবে প্রভাব বিস্তার করে । ১৯৪২ খিস্টাব্দের ডিসেম্বরে শিক্ষাক্রমের ঠিক অর্ধপথে তিনি শান্তিনিকেতন ছেড়ে কলকাতায় চলে আসেন ।

সত্যজিৎ রায়ের বংশানুক্রম প্রায় দশ প্রজন্ম অতীত পর্যন্ত বের করা সম্ভব। তার আদি পৈত্রিক ভিটা বর্তমান বাংলাদেশের কিশোরগঞ্জ জেলার কটিয়াদি উপজেলার মসূয়া গ্রামে অবস্থিত। সত্যজিতের পিতামহ উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী এবং বাবা সুকুমার রায় দুজনেরই জন্ম হয়েছিল এখানে।

উপেন্দ্রকিশোরের সময়েই সত্যজিতের পরিবারের ইতিহাস এক নতুন দিকে মোড় নেয়। লেখক, চিত্রকর, দার্শনিক, প্রকাশক ও শখের জ্যোতির্বিদ উপেন্দ্রকিশোরের মূল পরিচিতি ১৯শ শতকের বাংলার এক ধর্মীয় ও সামাজিক আন্দোলন ব্রাহ্ম সমাজের অন্যতম নেতা হিসেবে। উপেন্দ্রকিশোরের ছেলে সুকুমার রায় ছিলেন বাংলা সাহিত্যের ননসেন্স ও শিশু সাহিত্যের সেরা লেখকদের একজন। দক্ষ চিত্রকর ও সমালোচক হিসেবেও সুকুমারের খ্যাতি ছিল। ১৯২১ সালে কলকাতায় জন্ম নেন সুকুমারের একমাত্র সন্তান সত্যজিৎ রায়। সত্যজিতের মাত্র তিন বছর বয়সেই বাবা সুকুমারের মৃত্যু ঘটে; মা সুপ্রভা দেবী বহু কষ্টে তাকে বড় করেন। সত্যজিৎ বড় হয়ে কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে অর্থনীতি পড়তে যান, যদিও চারুকলার প্রতি সবসময়েই তার দুর্বলতা ছিল। ১৯৪০ সালে সত্যজিতের মা তাকে শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতিষ্ঠিত বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবার জন্য পীড়াপীড়ি করতে থাকেন। কলকাতাপ্রেমী সত্যজিৎ শান্তিনিকেতনের শিক্ষার পরিবেশ সম্বন্ধে খুব উঁচু ধারণা পোষণ করতেন না, কিন্তু শেষে মায়ের প্ররোচনা ও রবিঠাকুরের প্রতি শ্রদ্ধার ফলে রাজি হন। শান্তিনিকেতনে গিয়ে সত্যজিৎ প্রাচ্যের শিল্পের মর্যাদা উপলব্ধি করতে সক্ষম হন। পরে তিনি স্বীকার করেন যে, সেখানকার বিখ্যাত চিত্রশিল্পী নন্দলাল বসু এবং বিনোদ বিহারী মুখোপাধ্যায়ের কাছ থেকে তিনি অনেক কিছু শিখেছিলেন। 

চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়ের কর্মজীবন (Filmmaker Satyajit Ray’s career

বিজ্ঞাপন প্রতিষ্ঠানের শিল্পীকর্মী হিসেবে সত্যজিৎ রায়ের কর্মজীবন ১৯৪৩ – এ মাসিক আশি টাকা বেতনে ব্রিটিশ বিজ্ঞাপন কোম্পানি ডি . জি . কিমারে যােগ দেন । কয়েক বছরের মধ্যেই তিনি নিজগুণে এই প্রতিষ্ঠানের আর্ট ডিরেক্টরের পদে উন্নীত হন । তাঁর প্রথম চলচ্চিত্র ‘ পথের পাঁচালী’তে সাফল্যের পর তিনি ১৯৫৬ – তে বিজ্ঞাপনের চাকরিতে ইস্তফা দেন ।

“পথের পাঁচালী” ছবি বানানোর জন্য সত্যজিৎ কিছু পূর্ব-অভিজ্ঞতাবিহীন কুশলীকে একত্রিত করেন, যদিও তাঁর ক্যামেরাম্যান সুব্রত মিত্র ও শিল্প নির্দেশক বংশী চন্দ্রগুপ্ত দুজনেই পরবর্তীকালে নিজ নিজ ক্ষেত্রে খ্যাতিলাভ করেন। এ ছাড়া ছবির বেশির ভাগ অভিনেতাই ছিলেন শৌখিন। ১৯৫২ সালের শেষ দিকে সত্যজিৎ (Filmmaker Satyajit Ray) তাঁর নিজের জমানো পয়সা খরচ করে দৃশ্যগ্রহণ শুরু করেন। তিনি ভেবেছিলেন প্রাথমিক দৃশ্যগুলো দেখার পরে হয়ত কেউ ছবিটিতে অর্থলগ্নি করবেন। কিন্তু সে ধরনের আর্থিক সহায়তা মিলছিল না। পথের পাঁচালী-র দৃশ্যগ্রহণ তাই থেমে থেমে অস্বাভাবিকভাবে প্রায় দীর্ঘ তিন বছর ধরে সম্পন্ন হয়। কেবল তখনই দৃশ্যগ্রহণ করা সম্ভব হত যখন সত্যজিৎ বা নির্মাণ ব্যবস্থাপক অনিল চৌধুরী প্রয়োজনীয় অর্থের যোগান করতে পারতেন। শেষ পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গ সরকারের থেকে ঋণ নিয়ে ১৯৫৫ সালে ছবিটি নির্মাণ সম্পন্ন হয় ও সে বছরই এটি মুক্তি পায়। মুক্তি পাওয়ার পর পরই ছবিটি দর্শক-সমালোচক সবার অকুণ্ঠ প্রশংসা লাভ করে ও বহু পুরস্কার জিতে নেয়। ছবিটি বহুদিন ধরে ভারতে ও ভারতের বাইরে প্রদর্শিত হয়। ছবিটি নির্মাণের সময় অর্থের বিনিময়ে চিত্রনাট্য বদলের জন্য কোন অনুরোধই সত্যজিৎ রাখেননি। এমনকি ছবিটির একটি সুখী সমাপ্তির (যেখানে ছবির কাহিনীর শেষে অপুর সংসার একটি “উন্নয়ন প্রকল্পে” যোগ দেয়) জন্য পশ্চিমবঙ্গ সরকারের অনুরোধও তিনি উপেক্ষা করেন।

Filmmaker Satyajit Ray

ভারতে ছবিটির প্রতিক্রিয়া ছিল উৎসাহসঞ্চারী। দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়া-তে লেখা হয়, “It is absurd to compare it with any other Indian cinema … Pather Panchali is pure cinema” (“একে অন্য যেকোনও ভারতীয় চলচ্চিত্রের সাথে তুলনা করা অবাস্তব… পথের পাঁচালী হল বিশুদ্ধ চলচ্চিত্র”)। যুক্তরাজ্যে লিন্‌জি অ্যান্ডারসন চলচ্চিত্রটির অত্যন্ত ইতিবাচক একটি সমালোচনা লেখেন। তবে ছবিটির সব সমালোচনাই এ রকম ইতিবাচক ছিল না। বলা হয় যে ফ্রাঁসোয়া ত্রুফো ছবিটি দেখে মন্তব্য করেছিলেন: “কৃষকেরা হাত দিয়ে খাচ্ছে – এরকম দৃশ্যসম্বলিত ছবি আমি দেখতে চাই না।”দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর সবচেয়ে প্রভাবশালী সমালোচক বসলি ক্রাউদার ছবিটির একটি কঠোর সমালোচনা লেখেন এবং সেটি পড়ে মনে করা হয়েছিল যে ছবিটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মুক্তি পেলেও ভাল করবে না। কিন্তু এর বদলে ছবিটি সেখানে প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বেশি দিন ধরে প্রদর্শিত হয়।

সত্যজিতের (Filmmaker Satyajit Ray) পরবর্তী ছবি অপরাজিত-এর সাফল্য তাকে আন্তর্জাতিক মহলে আরও পরিচিত করে তোলে। এই ছবিটিতে তরুণ অপুর উচ্চাভিলাষ ও তার মায়ের ভালবাসার মধ্যকার চিরন্তন সংঘাতকে মর্মভেদী রূপে ফুটিয়ে তোলা হয়। বহু সমালোচক, যাদের মধ্যে মৃণাল সেন ও ঋত্বিক ঘটক অন্যতম, ছবিটিকে সত্যজিতের প্রথম ছবিটির চেয়েও ওপরে স্থান দেন।

অপরাজিত ভেনিসে গোল্ডেন লায়ন পুরস্কার জেতে। অপু ত্রয়ী শেষ করার আগে সত্যজিৎ আরও দুটি চলচ্চিত্র নির্মাণ সমাপ্ত করেন। প্রথমটি ছিল পরশ পাথর নামের একটি হাস্যরসাত্মক ছবি। আর পরেরটি ছিল জমিদারী প্রথার অবক্ষয়ের ওপর নির্মিত জলসাঘর, যেটিকে তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ হিসেবে গণ্য করা হয়।

সত্যজিৎ  ( Filmmaker Satyajit Ray অপরাজিত নির্মাণের সময় একটি ত্রয়ী সম্পন্ন করার কথা ভাবেননি, কিন্তু ভেনিসে এ ব্যাপারে সাংবাদিকদের জিজ্ঞাসা শুনে তার মাথায় এটি বাস্তবায়নের ধারণা আসে। অপু সিরিজের শেষ ছবি অপুর সংসার ১৯৫৯ সালে নির্মাণ করা হয়। আগের দুটি ছবির মত এটিকেও বহু সমালোচক সিরিজের সেরা ছবি হিসেবে আখ্যা দেন। এ ছবির মাধ্যমেই সত্যজিতের (Filmmaker Satyajit Ray) দুই প্রিয় অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ও শর্মিলা ঠাকুরের চলচ্চিত্রে আত্মপ্রকাশ ঘটে। ছবিটিতে অপুকে দেখানো হয় কলকাতার এক জীর্ণ বাড়িতে প্রায়-দরিদ্র অবস্থায় বসবাস করতে। এক অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে অপর্ণার সাথে অপুর বিয়ে হয়। তাদের জীবনের বিভিন্ন দৃশ্যে “বিবাহিত জীবন সম্পর্কে ছবিটির ধ্রুপদী ইতিবাচকতা ফুটে ওঠে”।

কিন্তু শীঘ্রই এক বিয়োগান্তক পরিস্থিতির উদ্ভব হয়। একজন বাঙালি সমালোচক অপুর সংসার-এর একটি কঠোর সমালোচনা লেখেন এবং সত্যজিৎ ( Filmmaker Satyajit Ray) এর উত্তরে ছবিটির পক্ষে একটি সুলিখিত নিবন্ধ লেখেন – যা ছিল সত্যজিতের কর্মজীবনে একটি দুর্লভ ঘটনা।

চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়ের চলচ্চিত্র পরিচালনা (Filmmaker Satyajit Ray directed the film):

চলচ্চিত্র শিল্পের এই প্রতিভাধর পুরুষ একের পর এক চলচ্চিত্র তৈরি করে চললেন । তার প্রথম ছবি ‘ পথের পাঁচালী ’ তাকে জনপ্রিয়তার তুঙ্গে নিয়ে যায় । ১৯৫৫ থেকে ১৯৫৬ পর্যন্ত তিনি এর জন্য অনেক পুরস্কার পেলেন । এরপর তিনি ‘ অপরাজিত ’ ( ১৯৫৬ ) ; পরশপাথর ’ ‘জলসাঘর ’ ( ১৯৫৮ ) ; ‘ অপুর সংসার ’ ( ১৯৫৯ ) ; ‘ দেবী ’ ( ১৯৬০ ) ; তিনকন্যা ’ ( ১৯৬১ ) ; কাঞ্চনজঙ্ ’ ( ১৯৬২ ) ; ‘ মহানগর ’ ( ১৯৬৩ ) ; ‘ চারুলতা ( ১৯৬৪ ) ; ‘ নায়ক ’ ( ১৯৬৬ ) ; ‘ চিড়িয়াখানা ’ ( ১৯৬৭ ) ; ‘ গুপী গাইন বাঘা বাইন ’ ( ১৯৬৯ ) ; ‘ অশনি সংকেত ’ ( ১৯৭৩ ) ; “ জয়বাবা ফেলুনাথ ’ ( ১৯৭৮ ) ; ‘ হীরক রাজার দেশে ’ ( ১৯৮০ ) ; আগন্তুক ‘ ( ১৯৯১ ) ইত্যাদি অসাধারণ সব ছবি পরিচালনা করেন । সত্যজিৎ রায় বেশ কয়েকটি তথ্যচিত্র এবং দূরদর্শন চিত্র রচনা করেন । এর মধ্যে ‘ রবীন্দ্রনাথ ‘ ( ১৯৬১ ) ; ‘ সিকিম ‘ ( ১৯৭১ ) ; “ ইনার আই ‘ ( ১৯৭৪ ) ; ‘ সুকুমার রায় ‘ ( ১৯৭৮ ) ইত্যাদি উল্লেখযােগ্য ।

চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়ের অন্যান্য কর্ম (Other works of filmmaker Satyajit Ray):

চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায় ( Filmmaker Satyajit Ray) চলচ্চিত্র পরিচালনার পাশাপাশি সংগীত পরিচালনার দায়িত্বভার হাতে তুলে নিয়েছিলেন । ‘ তিনকন্যা ‘ ছবি থেকেই তিনি এই দায়িত্ব নেন । তা ছাড়া এত কিছুর বাইরেও বলতে হয় বলা চলে পােস্টার শিল্পের তিনি অদ্বিতীয় শিল্পী । তার কিছু কিছু পােস্টার এক একটি নিখুঁত শিল্পবস্তু ।

কাছের মানুষদের কাছে সত্যজিতের ডাকনাম ছিল “মানিক”। তিনি তার সমসাময়িক চলচ্চিত্রকারদের চেয়ে সাধারণ জনগণের সাথে অনেক বেশি মিশেছেন। অচেনা লোকদের তিনি প্রায়ই সাক্ষাৎ দিতেন। কিন্তু সাক্ষাৎকারীদের অনেকেই সত্যজিৎ ( Filmmaker Satyajit Ray) ও তাদের মাঝে একটা দূরত্ব অনুভব করতেন। বাঙালিরা এটাকে ভাবতেন তার ইংরেজ মানসিকতার প্রকাশ, আর পশ্চিমীরা ভাবতেন তার শীতল ও গম্ভীর আচরণ ছিল ব্রাহ্মণদের মত। অভিনেতাদের প্রতি তার অগাধ আস্থা ছিল, কিন্তু তাদের অযোগ্যতায় বিরূপভাবও কখনো কখনো প্রকাশ করতেন।তার ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে সংবাদমাধ্যমে কখনোই তেমন আলোকপাত করা হয়নি, তবে কারও কারও মতে মাধবী মুখোপাধ্যায়ের সাথে ষাটের দশকে তার সম্পর্ক ছিল।

চারুলতা-পরবর্তী বছরগুলোতে সত্যজিৎ ( Filmmaker Satyajit Ray) ছিলেন বৈচিত্র্যের সন্ধানী; এসময় কল্পকাহিনী ও গোয়েন্দা কাহিনী থেকে শুরু করে ঐতিহাসিক ছবিও তিনি বানান। এ পর্বে তিনি তার ছবিগুলোতে প্রচুর পরীক্ষা নিরীক্ষা চালান এবং সমকালীন ভারতীয় জীবনের বিভিন্ন দিকগুলো তার ছবিতে অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করেন। এ পর্বে তার প্রথম প্রধান চলচ্চিত্র ছিল নায়ক, যার বিষয় ছিল এক চলচ্চিত্র তারকার সাথে এক সহানুভূতিশীল তরুণী সাংবাদিকের রেলযাত্রার সময়কার সাক্ষাৎ ও সংলাপ। উত্তম কুমার ও শর্মিলা ঠাকুর অভিনীত এই ছবিতে ট্রেন যাত্রার ২৪ ঘণ্টার পরিসরে এক আপাতসফল চলচ্চিত্র তারকার মনের অন্তর্সংঘাত গুলো উন্মোচন করা হয়। ছবিটি বার্লিনে সমালোচকদের পুরস্কার জিতলেও এটি নিয়ে তেমন আর কোন প্রতিক্রিয়া হয়নি। ১৯৬৭ সালে সত্যজিৎ  ( Filmmaker Satyajit Ray) দি এলিয়েন নামের একটি ছবির জন্য চিত্রনাট্য লেখেন। যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের যৌথ প্রযোজনার এই ছবিটির প্রযোজক ছিল কলাম্বিয়া পিকচার্স এবং পিটার সেলার্স ও মার্লোন ব্রান্ডো ছবিটির প্রধান অভিনেতা হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন। কিন্তু চিত্রনাট্য লেখা শেষ করার পর সত্যজিৎ জানতে পারেন যে সেটির স্বত্ব তার নয় ও এর জন্য তিনি কোন সম্মানও পাবেন না। পরবর্তীকালে মার্লোন ব্র্যান্ডো প্রকল্পটি ত্যাগ করেন। তার স্থানে জেমস কোবার্ন কে আনার চেষ্টা করা হয়, কিন্তু ততদিনে সত্যজিতের আশাভঙ্গ ঘটে এবং তিনি কলকাতায় ফিরে আসেন। পরে ৭০ ও ৮০-র দশকে কলাম্বিয়া বহুবার প্রকল্পটি পুনরুজ্জীবিত করার প্রচেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। ১৯৮২ সালে যখন স্টিভেন স্পিলবার্গের .টি. দ্য এক্সট্রা-টেরেস্ট্রিয়াল মুক্তি পায়, তখন অনেকেই ছবিটির সাথে সত্যজিতের লেখা চিত্রনাট্যের মিল খুঁজে পান। সত্যজিৎ ১৯৮০ সালে সাইট অ্যান্ড সাউন্ড ম্যাগাজিনে লেখা একটি ফিচারে প্রকল্পটির ব্যর্থতা নিয়ে কথা বলেন ও পরে সত্যজিতের জীবনী লেখক অ্যান্ড্রু রবিনসন এ ঘটনার ওপর আরও বিস্তারিত লেখেন। সত্যজিৎ বিশ্বাস করতেন যে তার লেখা দি এলিয়েন-এর চিত্রনাট্যটির মাইমোগ্রাফ কপি সারা যুক্তরাষ্ট্রে ছড়িয়ে না পড়লে স্পিলবার্গের ছবিটি বানানো হয়ত সম্ভব হত না।

সত্যজিতের ( Filmmaker Satyajit Ray) ছেলে সন্দ্বীপের অনুযোগ ছিল তিনি সবসময় বড়দের জন্য গম্ভীর মেজাজের ছবি বানান। এর উত্তরে ও নতুনত্বের সন্ধানে সত্যজিৎ ১৯৬৮ সালে নির্মাণ করেন তার সবচেয়ে ব্যবসাসফল ছবি গুপী গাইন বাঘা বাইন। এটি ছিল সত্যজিতের পিতামহ উপেন্দ্রকিশোরের লেখা ছোটদের জন্য একটি গল্পের ওপর ভিত্তি করে বানানো সঙ্গীতধর্মী রূপকথা। গায়ক গুপী ও ঢোলবাদক বাঘা ভুতের রাজার তিন বর পেয়ে ভ্রমণে বেরিয়ে পড়ে ও দুই প্রতিবেশী রাজ্যের মধ্যে আসন্ন যুদ্ধ থামানোর চেষ্টা করে। ছবিটির নির্মাণকাজ ছিল ব্যয়বহুল, এবং অর্থাভাবে সত্যজিৎ ছবিটি সাদা-কালোয় ধারণ করেন। যদিও তার কাছে বলিউডের এক অভিনেতা কে ছবিতে নেয়ার বিনিময়ে অর্থের প্রস্তাব এসেছিল, তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। এর পরে সত্যজিৎ তরুণ কবি ও লেখক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের লেখা একটি উপন্যাসের ওপর ভিত্তি করে অরণ্যের দিনরাত্রি ছবিটি নির্মাণ করেন। বলা হয় এই ছবিটির সঙ্গীত-কাঠামো চারুলতার চেয়েও বেশি জটিল ছিল। ছবিটিতে চার শহুরে তরুণ ছুটিতে বনে ঘুরতে যায় এবং একজন বাদে সকলেই নারীদের সাথে বিভিন্ন ঘটনায় জড়িয়ে পড়ে যা তাদের মধ্যবিত্ত চরিত্রের নানা দিক প্রকাশ করে। রবিন উডের মতে “[ছবিটির] একটিমাত্র দৃশ্য থেকেই…একটি ছোট গল্প লেখার রসদ পাওয়া সম্ভব। এ ছবিতে সত্যজিৎ মুম্বাই-ভিত্তিক অভিনেত্রী সিমি গারেওয়াল-কে এক আদিবাসী মহিলা হিসেবে চরিত্রায়ণ করেন; তাঁর মত শহুরে নারীকে সত্যজিৎ চরিত্রটির জন্য নির্বাচন করেছেন শুনে সিমি অবাক হয়েছিলেন।

অরণ্যের দিনরাত্রি-তে নির্মাণকুশলতা প্রদর্শনশেষে সত্যজিৎ (Filmmaker Satyajit Ray) মনোযোগ দেন তৎকালীন বাঙালি বাস্তবতার মর্মমূলে, যখন বামপন্থী নকশাল আন্দোলনের তীব্রতা সর্বত্র অনুভূত হচ্ছিল। সত্যজিৎকে প্রায়ই বলা হত তিনি সমসাময়িক ভারতীয় শহুরে অভিজ্ঞতার ব্যাপারে উদাসীন। এর জবাবে ১৯৭০-এর দশকে তিনি কলকাতাকে কেন্দ্র করে তিনটি ছবি বানান যেগুলো ‘‘কলকাতা ত্রয়ী’’ নামেও পরিচিত: প্রতিদ্বন্দ্বী  (১৯৭০), সীমাবদ্ধ (১৯৭১), এবং জন অরণ্য (১৯৭৫)। চলচ্চিত্র তিনটি আলাদাভাবে পরিকল্পনা করা হলেও বিষয়বস্তুর মিলের কারণে এগুলোকে একটি দুর্বল ত্রয়ী হিসেবে বিবেচনা করা হয়। প্রতিদ্বন্দ্বী-র নায়ক এক আদর্শবাদী তরুণ স্নাতক যার মোহমুক্তি ঘটলেও ছবির শেষ পর্যন্ত সে দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েনি। জন অরণ্য-র নায়ক আরেক তরুণ যে জীবিকা নির্বাহের জন্য দুর্নীতির কাছে আত্মসমর্পণ করে। এবং সীমাবদ্ধ-র অর্থনৈতিকভাবে সফল প্রধান চরিত্রটি আরও লাভ করার জন্য সমস্ত আদর্শ বিসর্জন দেয়। এগুলির মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বী ছবিতে সত্যজিৎ ভিন্ন ধরনের বর্ণনাভঙ্গি ব্যবহার করেন, যেখানে নেগেটিভ, স্বপ্নদৃশ্য ও হঠাৎ ফ্ল্যাশব্যাকের সহায়তা নেয়া হয়। এ ছাড়া ৭০-এর দশকে সত্যজিৎ তার নিজের লেখা জনপ্রিয় গোয়েন্দা কাহিনীর নায়ক ফেলুদার ওপর ভিত্তি করে সোনার কেল্লা ও জয় বাবা ফেলুনাথ ছবি দুটিও নির্মাণ করেন।

চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ  রায় ( Filmmaker Satyajit Ray) বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ নিয়ে একটি ছবি তৈরি করার কথা ভেবেছিলেন, কিন্তু পরে এ পরিকল্পনা ত্যাগ করেন এই মন্তব্য করে যে একজন চলচ্চিত্রকার হিসেবে তিনি শরণার্থীদের বেদনা ও জীবন-অভিযাত্রার প্রতিই বেশি আগ্রহী ছিলেন, তাদের নিয়ে রাজনীতির প্রতি নয়। ১৯৭৭ সালে সত্যজিৎ শতরঞ্জ কে খিলাড়ি নামের একটি হিন্দি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। ছবিটি মুন্সি প্রেমচাঁদ-এর একটি গল্প অবলম্বনে তৈরি করা হয়; ১৮৫৭ সালের ভারতীয় বিপ্লবের এক বছর আগে অযোধ্যা রাজ্যের লক্ষ্ণৌ ছিল গল্পটির পটভূমি। ছবিটিতে ভারতে ব্রিটিশ উপনিবেশবাদের সূত্রপাতের ঘটনার বিবরণ দেয়া হয়েছে। এটিই ছিল বাংলা ভাষার বাইরে অন্য ভাষায় নির্মিত সত্যজিতের প্রথম চলচ্চিত্র। এটি আরও ছিল তার সবচেয়ে ব্যয়বহুল ও তারকাসমৃদ্ধ ছবি, যাতে সঞ্জীব কুমার, সাইদ জাফরি,  আমজাদ খান, শাবানা আজমি, ভিক্টর বন্দ্যোপাধ্যায়  ও রিচার্ড অ্যাটনবারা-র মত অভিনেতারা অংশ নেন।

পরবর্তীকালে চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায় ( Filmmaker Satyajit Ray) প্রেমচাঁদের গল্পের ওপর ভিত্তি করে হিন্দি ভাষায় এক-ঘণ্টা দীর্ঘ সদগতি নামের একটি ছবি নির্মাণ করেন। ছবিটিতে ভারতে বিদ্যমান অস্পৃশ্যতার ক্রূর বাস্তবতাকে তুলে ধরা হয়। ১৯৮০ সালে সত্যজিৎ গুপী গাইন বাঘা বাইন ছবির পরবর্তী পর্ব হীরক রাজার দেশে নির্মাণ করেন, যেটিতে তার রাজনৈতিক মতামতের প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। ছবিটির চরিত্র হীরক রাজা ছিল ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর জরুরি অবস্থা ঘোষণাকালীন সরকারের প্রতিফলন। বহুল প্রশংসাপ্রাপ্ত স্বল্পদৈর্ঘ্যের চলচ্চিত্র পিকু নির্মাণের মধ্য দিয়ে চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়ের ( flimmaker Satyajit Ray) কর্মজীবনের এই পর্বের সমাপ্তি ঘটে।

চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়ের সাহিত্যকর্ম (Literary work of filmmaker Satyajit Ray):

এর পাশাপাশি সত্যজিৎ রায় সাহিত্যসৃষ্টির সঙ্গে যুক্ত হয়ে ১৯৬০ খ্রিস্টাব্দে তার পূর্বসূরিদের প্রিয় ‘ সন্দেশ ‘ পত্রিকা পুনঃপ্রকাশ করলেন । নিজেও সেখানে লিখতে শুরু করলেন । এভাবে সৃষ্টি হল ফেলুদা , তপসে , জটায়ু , প্রফেসর শঙ্কুর মতাে চরিত্রগুলি । এ প্রসঙ্গে তার নিম্নলিখিত সৃষ্টিগুলি জনপ্রিয় বাদশাহী আংটি ‘ , ‘ একডজন গল্প ’ , ‘গ্যাংটকে গণ্ডগােল ‘ , ‘ সােনার কেল্লা ‘ ( ১৯৭১ ) ; ‘বাক্সরহস্য ‘ ( ১৯৯৩ ) ; সাবাশ প্রফেসর শঙ্কু ( ১৯৭৪ ) “জয়বাবা ফেলুনাথ ” ( ১৯৭৬ ) ইত্যাদি । তিনি শুধুমাত্র সাহিত্যকর্ম নিয়ে থাকলেও বাংলা সাহিত্যে তার শিল্পকর্মের অক্ষয়কীর্তির প্রমাণ পাওয়া যেত ।

চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়(Filmmaker Satyajit Ray) বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে জনপ্রিয় দুটি চরিত্রের স্রষ্টা। একটি হল প্রাতিজনিক গোয়েন্দা ফেলুদা, অন্যটি বিজ্ঞানী প্রফেসর শঙ্কু। এছাড়া তিনি প্রচুর ছোটগল্প লিখেছেন যেগুলো বারটির সংকলনে প্রকাশ পেত এবং সংকলনগুলোর শিরোনামে “বার” শব্দটি বিভিন্নভাবে ব্যবহৃত হত (যেমন ‘‘একের পিঠে দুই”, “এক ডজন গপ্পো”, ইত্যাদি)। ধাঁধা ও শব্দ-কৌতুক -এর প্রতি তার আগ্রহ এ গল্পগুলোতে প্রকাশ পায়। অনেক সময় ফেলুদাকে ধাঁধাঁর সমাধান বের করে কোন কেসের রহস্য উন্মোচন করতে হত। ফেলুদার বিভিন্ন গল্পে তার সঙ্গী উপন্যাস-লেখক জটায়ু (লালমোহন গাঙ্গুলি), আর তার খুড়তুতো ভাই তপেশরঞ্জন মিত্র ওরফে তোপসে হচ্ছে গল্পের বর্ণনাকারী, যার ভূমিকা অনেকটা শার্লক হোমসের পার্শ্বচরিত্র ডক্টর ওয়াটসনের মত। প্রফেসর শঙ্কুর বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীগুলো ডায়েরী আকারে লেখা, যে ডায়েরী বিজ্ঞানীটির রহস্যময় অন্তর্ধানের পর খুঁজে পাওয়া যায়। সত্যজিতের ছোটগল্পগুলোতে অনিশ্চিত উৎকণ্ঠা, ভয় ও অন্যান্য বিষয়ে সত্যজিতের আগ্রহের ছাপ পড়ে, যে ব্যাপারগুলো তিনি চলচ্চিত্রে এড়িয়ে চলতেন। সত্যজিতের অধিকাংশ রচনাই ইংরেজিতে অনূদিত হয়েছে এবং বর্তমানে তার বইগুলোর দ্বিতীয় প্রজন্মের পাঠকসমাজ গড়ে উঠেছে।

তার লেখা অধিকাংশ চিত্রনাট্যও “একশান” সাহিত্যপত্রে বাংলায় প্রকাশিত হয়েছে। সত্যজিৎ ( Filmmaker Satyajit Ray) তার ছেলেবেলার কাহিনী নিয়ে লেখেন যখন ছোট ছিলাম (১৯৮২)। চলচ্চিত্রের ওপর লেখা তার প্রবন্ধের সংলনগুলো হল: আওয়ার ফিল্মস, দেয়ার ফিল্মস (১৯৭৬), বিষয় চলচ্চিত্র (১৯৮২), এবং একেই বলে শুটিং (১৯৭৯)। ৯০-এর দশকের মাঝামাঝি সত্যজিতের চলচ্চিত্র বিষয়ক নিবন্ধের একটি সঙ্কলন পশ্চিমে প্রকাশ পায়। এই বইটির নামও Our Films, Their Films। বইটির প্রথম অংশে সত্যজিৎ ভারতীয় চলচ্চিত্র নিয়ে আলোচনা করেন, এবং দ্বিতীয় অংশে হলিউড, কিছু পছন্দের চিত্রনির্মাতা (চার্লি চ্যাপলিন,আকিরা কুরোসাওয়া) ও ইতালীয় নব্যবাস্তবতাবাদের ওপর আলোচনা করেন। বিষয় চলচ্চিত্র বইটিতে চলচ্চিত্রের নানা বিষয়ে সত্যজিতের ব্যক্তিগত দর্শন আলোচিত হয়েছে। স ম্প্রতি বইটির একটি ইংরেজি অনুবাদ Speaking of Films নামে প্রকাশ পেয়েছে। এছাড়াও সত্যজিৎ ‘‘তোড়ায় বাঁধা ঘোড়ার ডিম’’ নামে একটি ননসেন্স ছড়ার বই লেখেন, যেখানে লুইস ক্যারলের ‘‘জ্যাবারওয়কি’’-র একটি অনুবাদ রয়েছে।

সত্যজিৎ “রে রোমান” (Ray Roman) ও “রে বিজার” (Ray Bizarre) নামের দুইটি টাইপফেস নকশা করেন।

চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়ের সম্মানলাভ(Gained the respect of filmmaker Satyajit Ray):

সারাজীবনে সত্যজিৎ রায় ভিন্নমুখী শিল্পকর্মের জন্য বিভিন্ন পুরস্কার পেয়েছেন । ক্যামেরায় ছবি তােলার জন্য ১৯৩৬ – এ বয়েজ ওন পেপার ‘ পত্রিকায় প্রথম পুরস্কার প্রাপ্তি থেকে তার জয়গাত্রা ও পুরস্কার প্রাপ্তির শােভাযাত্রা শুরু দেশে এবং বিদেশে । ভারত সরকার কর্তৃক তিনি ১৯৫৮ – তে , ‘পদ্মশ্রী ‘ , ১৯৬৫ – তে ‘ পদ্মভূষণ ’ পুরস্কার পান । ১৯৬৭ – তে তিনি পান ‘ অ্যাকাডেমি পুরস্কার ‘ ; এই বছরই পান ‘ম্যাগসেসাই ‘ পুরস্কার । বিশ্বভারতী কর্তৃক ‘ দেশিকোত্তম ‘ পান ১৯৭৮ খ্রিস্টাব্দে । ১৯৮২ – তে তিনি পান ‘ ভিকান্তি ‘ , ‘হেলেস অ্যাঞ্জেল ট্রফি । ফরাসি সরকার কর্তৃক লিজিয়ন অব অনার ‘ পান ১৯৮৭ খ্রিস্টাব্দে । শেষ পর্যন্ত চলচ্চিত্র সৃষ্টির শ্রেষ্ঠতম নােবেল পুরস্কারস্বরূপ নিউইয়র্কের অ্যাকাডেমি অব মােশন পিকচার্স ‘ কর্তৃক ‘ লাইফ টাইম অ্যাচিভমেন্ট ’ এর জন্য বিশেষ ‘ অস্কার পুরস্কার পান ১৯৯২ খ্রিস্টাব্দে এবং এবছরই তিনি ভারত সরকারের শেষ ও শ্রেষ্ঠ পুরস্কার ‘ ভারতরত্ন ‘ পান । এ ছাড়া দেশে ও বিদেশের চলচ্চিত্র উৎসবে তিনি পেয়েছেন অসংখ্য পুরস্কার ।

সত্যজিৎ রায়ের সম্মানলাভ
সত্যজিৎ রায়ের সম্মানলাভ

চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে সত্যজিৎ ( Filmmaker Satyajit Ray) ছিলেন বহুমুখী এবং তার কাজের পরিমাণ বিপুল। তিনি ৩৭টি পূর্ণদৈর্ঘ্য কাহিনীচিত্র,  প্রামাণ্যচিত্র ও স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। তার নির্মিত প্রথম চলচ্চিত্র পথের পাঁচালী (১৯৫৫) ১১টি আন্তর্জাতিক পুরস্কার লাভ করে, এর মধ্যে অন্যতম ১৯৫৬ কান চলচ্চিত্র উৎসবে পাওয়া “শ্রেষ্ঠ মানব দলিল” (Best Human Documentary) পুরস্কার। পথের পাঁচালীঅপরাজিত (১৯৫৬) ও অপুর সংসার (১৯৫৯) – এই তিনটি একত্রে অপু ত্রয়ী নামে পরিচিত, এবং এই চলচ্চিত্র-ত্রয়ী সত্যজিতের জীবনের শ্রেষ্ঠ কর্ম হিসেবে বহুল স্বীকৃত। চলচ্চিত্র মাধ্যমে সত্যজিৎ চিত্রনাট্য রচনা, চরিত্রায়ন, সঙ্গীত স্বরলিপি রচনা, চিত্রগ্রহণ, শিল্প নির্দেশনা, সম্পাদনা, শিল্পী-কুশলীদের নামের তালিকা ও প্রচারণাপত্র নকশা করাসহ নানা কাজ করেছেন। চলচ্চিত্র নির্মাণের বাইরে তিনি ছিলেন একাধারে কল্পকাহিনী লেখক, প্রকাশক, চিত্রকর, গ্রাফিক নকশাবিদ ও চলচ্চিত্র সমালোচক। বর্ণময় কর্মজীবনে তিনি বহু আন্তর্জাতিক পুরস্কার পেয়েছেন, যার মধ্যে বিখ্যাত হল ১৯৯২ সালে পাওয়া একাডেমি সম্মানসূচক পুরস্কার  (অস্কার), যা তিনি সমগ্র কর্মজীবনের স্বীকৃতি হিসেবে অর্জন করেন। তিনি এছাড়াও ৩২টি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, ১টি গোল্ডেন লায়ন, ২টি রৌপ্য ভল্লুক লাভ করেন।

তিনি বেশ কয়েকটি ছোট গল্প এবং উপন্যাস রচনা করেছেন, প্রাথমিকভাবে শিশু-কিশোরদের পাঠক হিসেবে বিবেচনা করে। কল্পবিজ্ঞানে তার নির্মিত জনপ্রিয় কাল্পনিক চরিত্র গোয়েন্দা ফেলুদা এবং প্রোফেসর শঙ্কু।

সত্যজিৎ অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানসূচক ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৯২ সালে ভারত সরকার তাকে দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার ভারত রত্ন সম্মাননা প্রদান করে। সত্যজিৎ ভারত রত্ন এবং পদ্মভূষণসহ সকল মর্যাদাপূর্ণ ভারতীয় পুরস্কার লাভ করেছেন।

উপসংহারঃ

চলচিত্রকার সত্যজিৎ রায় ( Filmmaker Satyajit Ray) আজ আর আমাদের মধ্যে নেই । মহৎ সত্যকে জয় করে তিনি চলে গেছেন আমাদের অস্তিত্বের সীমার বাইরে । তার এই মহাপ্রয়াণ হােক মহা – অধিষ্ঠান ; তা ছড়িয়ে পড়ুক বঙ্গভূমি থেকে বিশ্বভূমিতে । তার অসামান্য সাফল্যের মূলে আছে শিল্পীর জন্মগত প্রতিভা , পারিবারিক ঐতিহ্য ও আজীবন সাধনার সংমিশ্রণ । এসবের সার্থক সম্মিলনেই তিনি একাধারে সাহিত্যরচনা , শিল্পসাধনা , চিত্রপরিচালনা প্রভৃতি বহুমুখী কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ লাভ করেছেন । অগণিত দুর্লভ শিরােপা । শিল্প – সাহিত্যজগতে তার আদর্শ আমাদের অনুপ্রাণিত করে । তার অমর আত্মার প্রতি আমাদের বিনম্র প্রণাম ।

আরও পডুনঃ ইশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের জীবনী

Leave a Reply